যিনি যা চেয়েছেন তিনি তা পেয়েছেন (১)
আমাদেরকে খবর দিয়েছেন শায়খ আবুল ফুতুহ মুহাম্মদ ইবনে শায়খ আবুল মাহসিন ইয়ুসুফ ইবনে ইসমাঈল ইবনে আহমদ ইবনে আলী ক্বরশী তামীমী বাকারী বাগদাদী ক্বাত্বফীনী হাম্বলী, কায়রােতে ৬০৮ হিজরীতে।
তিনি বলেন, আমাদেরকে খবর দিয়েছেন শায়খ-ই শরীফ আবূ জাফর মুহাম্মদ ইয়ার আবুল কাসিম লবীব ইবনে নাফীস ইবনে আবুল করম ইয়াহিয়া আলাভী হাসানী, বাগদাদে ৬৩০ হিজরীতে।
তিনি বলেন, আমাদেরকে খবর দিয়েছেন শায়খ-ই আরিফ আবুল খায়র মুহাম্মদ ইবনে মাহফুয ইবনে উতায়মাহু, বাগদাদে আপন গৃহে, যা বাব-ই আযজে অবস্থিত ছিলাে, ৩ রজব, ৫৯৩ হিজরীতে।
তিনি বলেন, আমি এবং শায়খ আবুস সাউদ ইবনে আবু বকর হারীমী, শায়খ মুহাম্মদ ইবনে ক্বা-ইদুল আওয়ানী, শায়খ আবু মুহাম্মদ হাসান ফারেসী, শায়খ জমীল সাহেবুল খুতওয়াহ্ ওয়ায যাক্বাহ, শায়খ আবুল কাসেম ওমর ইবনে মাসউদ বাযযার, শায়খ আবূ হাফস ওমর ইবনে আবু নাসর গাযযাল, শায়খ খলীল ইবনে শায়খ আহমদ সরসরী, শায়খ আবুল বরকাত আলী ইবনে গানা-ইম ইবনে ফাত্হ আদাভী ‘আমরী বাতা-ইহী হুমামী, শায়খ আবুল ফুতুহ নাসর ইবনে আবুল ফারাজ মুহাম্মদ ইবনে আলী বাগদাদী মুক্বরী, ওরফে ইবনুল খাদ্বিরী, আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ওয়াযীর আউন উদ্দীন আবুল মুযাফফার ইবনে হুবায়রাহ্, আবুল ফুতুহ আবদুল্লাহ্ ইবনে হিবাতুল্লাহ ও আবুল কাসিম আলী ইবনে মুহাম্মদ ইবনে সাহিব- এসব মাশাইখ আমাদের শায়খ হযরত মুহিউদ্দীন আব্দুল ক্বাদির জীলানী রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু’র দরবারে তাঁর মাদ্রাসায় উপস্থিত ছিলেন। তখন তিনি তাদের উদ্দেশে বললেন, “তােমাদের মধ্যে প্রত্যেকে আপন আপন প্রয়ােজন চাও, আমি তাকে তা দেবাে।
তখন শায়খ আস সাঊদ বললেন, “আমি ইখতিয়ার (ইচ্ছা) বর্জন করতে চাই।” আর শায়খ ইবনে ক্বা-ইদ বললেন, “আমি মুজাহাদাহর শক্তি চাই।” শায়খ বাযযার বললেন, “আমি আল্লাহর ভয় চাই।” শায়খ আবুল হাসান ফারেসী বলেন, “আল্লাহর সাথে আমার একটি হাল’ (বিশেষ মুর্চ্ছনাময় অবস্থা) ছিলাে, যা আমি হারিয়ে ফেলেছি। আমি চাচ্ছি- তা যেন ফিরে পাই।” শায়খ জমীল বলেছেন, “আমি সময়ের হিফাযত চাই।” শায়খ ওমর গাযযাল বলেন, “আমি ইলমের বৃদ্ধি চাই। শায়খ খলীল ইবনে সরসরী বলেন, “আমি চাই- কুতবিয়াতের স্তর পাওয়ার পূর্বে যেন আমার মৃত্যু না হয়। শায়খ আবুল বরকাত হুমামী বলেন, “আমি আল্লাহর ভালবাসায় ডুবে থাকতে চাই।” শায়খ আবুল ফুতুহ ইবনুল খাদ্বিরী বলেন, “আমি কোরআন ও হাদীস হিফয করতে চাই। আর আমি বললাম, “আমি চাচ্ছি- আমি যেন আল্লাহর ঘাটগুলাে এবং অন্যান্য বস্তুগুলাের মধ্যে পার্থক্য করতে পারি।” আবু আবদুল্লাহ ইবনে হুরায়রাহ বলেন, “আমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি হতে চাই।” আবুল ফুতুহ ইবনে হিবাতুল্লাহ বলেন, “আমি (খলীফার) ঘরের ওস্তাদ হতে চাই।” আবুল কাসিম ইবনে সাহেব বলেন, “আমি বাব-ই আযীয’-এর রক্ষক হতে চাই।”
তখন শায়খ আবদুল ক্বাদের জীলানী রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বললেন, “আমি তাদের মধ্যে প্রত্যেকের সাহায্য করছি। আর এ জিনিষগুলাে হচ্ছে তােমার রবের দান। বস্তুতঃ তােমার রবের দান নিষিদ্ধ (রুদ্ধ) নয়।”
আবুল খায়র বলেছেন, আল্লাহরই শপথ! তাঁদের প্রত্যেকে যা যা চেয়েছিলেন তা পেয়ে গেছেন। আমি প্রত্যেককে ওই অবস্থায় দেখেছি, যা তিনি ইচ্ছা করেছিলেন। শায়খ খলীল ইবনে সরসরী ব্যতীত। কারণ তার উপর তখনাে ওই সময় আসেনি, যাতে তাকে কুত্ববিয়াত' প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিলাে।
শায়খ আবুস সাউদ-এর এ অবস্থা হয়েছে যে, তিনি ইখতিয়ার বর্জন করার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছে গেছেন। আর তিনি তাতে বহু পূর্ববর্তী বুযুর্গকেও ছাড়িয়ে গেছেন। আমি তাকে বলতে শুনেছি, “আমার মনে কখনাে ওই কথা আসেনি, যা আমার নামাযের মুসাল্লা বহির্ভূত হয়। তার অবস্থা এমন ছিলাে যে, তেমনি খুব কমই হয়।”
শায়খ ইবনে ক্বাইদ-এর মুজাহাদাহ এতােই মজবুত হয়ে গিয়েছিলাে যে, তার সমকালীনদের থেকে আমাদের কারাে এমন মুজাহাদাহ (আধ্যাত্মিক সাধনা)র কথা জানাই ছিলাে না। তিনি আযাজে যমীনের নিচে ২৮ বছর যাবৎ বসেছে। আমি তাঁকে ৫৬৯ হিজরীতে বলতে শুনেছিলাম, “আমি অসহনীয় ক্ষুধার্ত ও পিপাসায় কাতর ছিলাম। বহু শয়ন করেছি এবং বহু জাগ্রত হয়েছি। বহু ভয় করেছি। বালা-মুসীবত আমার নিকট থেকে পালাতে থাকতাে। আল্লাহ আপন নির্দেশ দানে বিজয়ী। (পরাক্রমশালী)।"
শায়খ ওমর বাযযায ভয়'-এ অতি উঁচু মর্যাদায় পৌছে গেছেন। এমনকি প্রচণ্ড ভয়ের চোটে কখনাে কখনাে তার মগজ থেকে পানি টপকে পড়ে তার গলায় নেমে এসেছিলাে।
শায়খ আবুল হাসান ফারেসী-এর দিকে শায়খ আবদুল ক্বাদির রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু আপন মজলিসে বসা অবস্থায় তাকালেন। ফলে তিনি ভয় পেয়ে গেলেন। আর তখনই দাঁড়িয়ে গেলেন। পরবর্তী দিনে আমি তার সাথে সাক্ষাৎ করেছি। আর অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বললেন, “যে-ই হাল' (মুর্চ্ছনাময় অবস্থা) আমি হারিয়ে বসেছিলাম, শায়খ আমাকে ওই অবস্থা ফিরিয়ে দিয়েছেন; বরং ওই দৃষ্টিতে আরাে বেশী দিয়েছেন।” শায়খ জমীল-এর এ অবস্থা এ হলাে যে, প্রতিটি সময় ও মুহূর্তের হিফাযতের ক্ষেত্রে আমাদের জানা মতে তিনি এই স্তরে পৌঁছে গিয়েছিলেন যে, আর কেউ ওই স্তর পর্যন্ত পেীছেনি। এমনকি তিনি শৌচাগারে যাবার সময় আপন তাসবীহ' দেয়ালের পেরেকের সাথে লটকিয়ে যেতেন। আর সেটার দানা একেকটি করে (নিজে নিজে) ঘুরপাক খেতাে, যতক্ষণ না তিনি সেটাকে হাতে নিতেন। আমি তার এ অবস্থা বহুবার দেখেছি। শায়খ খলীল সরসরীকে শায়খ আবদুল ক্বাদির রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু তার ওই মজলিসেই বলেছেন, হে খলীল! তুমি যতক্ষণ পর্যন্ত ক্বুত্বব হবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত তােমার মৃত্যু হবে না।” আমি তাকে বহুবার বলতে শুনেছি, “খলীল সরসরী যতক্ষণ পর্যন্ত কুত্বব হবেন না, ততক্ষণ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবেন না।” শায়খ ওমর গাযযাল বিভিন্ন বিষয়ের জ্ঞান আহরণ এবং অনেক কিছু মুখস্থ করে নিয়েছিলেন। আর তাঁর গ্রন্থ ভাণ্ডার থেকে হাজারের চেয়ে বেশী কিতাব বিক্রি করা হয়েছে। এজন্য তাকে তিরস্কার করা হয়েছে। তখন তিনি বললেন, “এ সবই আমার মুখস্থ আছে।"
শায়খ আবুল বরকাত হুমামীর দিকে শায়খ আবদুল ক্বাদির রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু, যখন তিনি মজলিশে উপবিষ্ট ছিলেন, এমন দৃষ্টি দিলেন যে, তিনি বেহুশ হয়ে পড়েছিলেন। তখন তাঁকে তাঁর সামনে থেকে তুলে নেয়া হলাে। তখন তার মধ্যে মােটেই হুঁশ ছিলাে না। আমরা তাঁকে বেশ কিছুদিন বাগদাদে অনুপস্থিত গেলাম। অতঃপর আমরা তাকে কিছুদিন পর করখের ময়দানে এমতাবস্থায় দেখতে পেলাম যে, তিনি আসমানের দিকে এক নজরে তাকিয়ে আছেন। আমি তার সাথে কথা বলতে চাইলাম। তিনি আমাকে জবাব দিলেন না। অতঃপর আমি ফিরে এলাম। তারপর আমি কয়েক বছর পর বসরায় গেলাম। আমি আবার তাকে পূর্ববর্তী অবস্থায় দেখলাম। এবার তিনি শহরের বাইরে মরুভূমিতে একটি টিলার উপর উপবিষ্ট ছিলেন। আমি তার নিকট গেলাম। তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম। এবারও তিনি আমার কথার জবাব দিলেন না। তারপর আমি গিয়ে তাঁর সামনা-সামনি হয়ে (একটু দূরে) বসে গেলাম। আর আমি বললাম, “হে আল্লাহ! হযরত শায়খ আবদুল ক্বাদিরের ওসীলায় তাঁর মধ্যে আক্বল (হুঁশ) ফিরিয়ে দাও, যেন আমার সাথে কথা বলেন। তখন তিনি দাঁড়ালেন। আমার নিকট আসলেন এবং আমাকে সালাম বললেন। আমি তাকে বললাম, “এ কেমন অবস্থা।” তিনি বললেন, “ভাই সাহেব। ওই এক নজরে, যা শায়খ আবদুল ক্বাদির আমার দিকে করেছিলেন, আমাকে আল্লাহর এমন ভালাবাসা দেওয়া হয়েছে, যা আমাকে আত্মা ও অস্তিত্ব থেকেও অদৃশ্য (অনুপস্থিত) করে দিয়েছে। যেমনি তুমি আমাকে দেখছে, আমাকে এ অবস্থায় করে দেওয়া হয়েছে। তারপর তিনি আপন জায়গায় চলে গেলেন এবং ওই অবস্থায় ফিরে গেলেন যেমনি তিনি ছিলেন। আমি কেঁদে কেঁদে ফিরে এলাম। এরপর আমি খবর পেলাম যে, তিনি ওই অবস্থায় ৫৭৩ হিজরীতে ইন্তিকাল করেছেন।
(বাহজাতুল আসরার ৯৯,১০০,১০১,১০২,১০৩)
%20majlisbd%20%E0%A6%AE%E0%A6%9C%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%B6%20%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87.jpg)